যত দোষ – নন্দ না আনন্দ ঘোষ !

আপনার ঘর থেকে আগুন এসে আমার ঘর পুড়ে গেলে আপনাকে দোষী বলতেই পারি। কিন্তু ঘটনাটা যদি এমন হয় যে,  আমিই, আপনার ঘরে আগুন লাগিয়েছিলাম, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে?

আরেকটু খোলাসা করে ফেলি, নাহলে কারো কারো বুঝতে বেশি সময় নিতে হতে পারে।

১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকার কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে পাহাড়িদের যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি হয় তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭০ সালের রাঙ্গামাটি কম্যুনিস্ট পার্টির (RCP) অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (PCJSS) মুলত  রাঙ্গামাটি কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা- কর্মীদের নিয়েই আত্ন প্রকাশ করে। তাই, অনেকেই PCJSS কে  অনেকেই RCP এর রুপান্তর হিসেবে বিবেচনা করেন।

এম এন লারমাসহ তৎকালীন কম্যুনিস্টদের প্রায় সবাই ছিল মাওবাদী, যারা বিশ্বাস করত যে, বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস। যার ফলে ১৯৭২ সাল থেকেই শান্তি বাহিনীর অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়, যদিও অফিশিয়ালি এর জন্ম ৭ জানুয়ারী ১৯৭৩ সালে। তাদের সুবিধা ছিল মূলত দু’টি, প্রথমত, উপজাতি রাজাকারদের (CAF) অনেকের অস্ত্র প্রশিক্ষণ ছিল। দ্বিতীয়ত, দেশের অন্যান্য স্থানে সকল রাজাকারকে নিরস্ত করা সম্ভব হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটা একই দ্রুততায় সম্ভব হয়নি, তাই তাদের অস্ত্রও ছিল।

১৯৭৩ সালের ১২ ফেব্রুআরিতে প্রথমবার পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে  বঙ্গবন্ধু রাঙ্গামাটিতে এক ভাষণে বলেন,


 “ব্রিটিশরা আপনাদেরকে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে রেখেছিল। পাকিস্তানিরাও একই কাজ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন জাতি এবং আপনারাও মুক্ত মানুষ। সুতরাং পৃথক পরিচয়ের ব্যাপারে কুচক্রীরা আপনাদের কী বলেছে – তা ভুলে যান এবং এই স্বাধীন জাতির অন্য সকলের মত একই অধিকার উপভোগ করার জন্যে  বাঙালী হয়ে উঠুন।“

“ (The British kept you as second- and third-class citizens, the Pakistanis did the same, but now Bangladesh is a free nation and you are free people. So, forget what mischief-makers tell you about your separate identity and become Bengalis to avail yourselves of the same rights others will have in this free nation. (Subir Bhaumik, 1996, Insurgent Crossfire, p. .260).

অথচ, এই এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে বাঙালি তথা বাংলাদেশ বিরোধী মনোভাবের জোয়ার সৃস্টি করে ফেলা হয়, মুলত বক্তব্যের অপব্যাখ্যা এবং অপপ্রচারের মাধ্যমে । তৎকালীন আইন শৃংখলা বাহিনীর কিছু কিছু কর্মকাণ্ড এতে পরোক্ষভাবে হলেও ভূমিকা রাখে। ফলে ১৯৭৩ – ১৯৭৫ সালে দলে দলে তরুণ পাহাড়িরা শান্তি বাহিনীতে যোগ দেয়; চলতে থাকে সামরিক প্রশিক্ষণ।  

এর পরের ইতিহাস সবারই জানা থাকার কথা। তারপরেও কয়েকটা তথ্য যোগ করতে চাই।

এক পুলিশ পোষ্ট এবং পুলিশ পেট্রোলের উপর আক্রমনের মাধ্যমে ১৯৭৬ সালে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনা ঘটে। যার প্রতিক্রিয়ার সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ১৯৭৭ সাল থেকে সরকার সমতল হতে পাহাড়ে সেনা মোতায়েন শুরু করে। এর পর থেকে একের পর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটতে থাকে পাহাড়ে, যা সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ নিরীহ পাহাড়িরা।  তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ,  ১৯৭৭ সালের সেনা মোতায়েন আর ১৯৭৯ – ৮২ সালের বাংগালি পুনর্বাসন।  

 বলাই বাহূল্য, বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় সরকারীভাবে গৃহীত একটি পদক্ষেপও নেই, যা পাহাড়িদের স্বার্থহানি করেছে। বরং একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি এই পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর প্রতি তার সহমর্মিতা এবং আন্তরিকতা প্রমাণ করেছিলেন। অথচ, ঐ একই সময়কালে (১৯৭২-৭৫ সালে), শান্তি বাহিনী তাদের সমর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, বাঙালি এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে।

তাই, আজ যারা পাহাড়ের সমস্ত সমস্যার মুলে শুধুমাত্র সেনা- সেটলার  খুঁজে পায়, তাদেরকে একতরফাভাবে দোষ দিবো না। কারণ, অনেকেই স্বভাবগতভাবেই কারো না কারো দোষ ধরতে পছন্দ করে। কেউ কেউ আবার জেনেশুনেই নিজের দুর্বলতা আড়াল করতেও এমনটা করে থাকে। 

তবে, আমার অনুরোধ থাকবে কয়েকটা বিষয় ভেবে দেখার। আমাকে উত্তর দেয়ার দরকার নেই। 

১। দেশ বিভাগের কত বছর পরে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা পেশ করছিল এবং কি প্রেক্ষাপটে ? 
অন্যদিকে, স্বাধীনতার কত দিন (বছর বা মাস নয়), পরে পাহাড়ের কিছু নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন সম্বলিত  চার দফা দাবী  পেশ করেছিল?

২। ১৯৭৩ সালে শান্তি বাহিনী সৃষ্টি না হলে, এবং ১৯৭৬ সালে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু না করলে, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৭ সালে শান্তি বাহিনীর বিরুদ্ধে সেনাদের পাহাড়ে পাঠাতে বাধ্য হতো কিনা? 

৩। স্থানীয় পাহাড়িরা শান্তি বাহিনীকে সহায়তা না করলে, বাঙালিদের পাহাড়ে নেয়ার চিন্তা কারো মাথায় আসতো কিনা? 

৪। এখন যারা অস্ত্রধারী রেখেছে, তারা অস্ত্র দিয়ে কি স্বায়ত্বশাসন আদায় করবে ? যেটা শান্তি বাহিনী চেয়েছিল, প্রতিক্রিয়ায় সেনা মোতায়ন হয়েছে। নাকি, অস্ত্র দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়ন করবে ? অথচ, চুক্তির প্রধান দিকই ছিল অস্ত্র সমর্পণ। তাহলে, নিজেরা অস্ত্র রেখে একদিকে চুক্তির বরখেলাপ কারা করছে এবং অপরদিকে চুক্তির সম্পূর্ণ  বাস্তবায়ন না হওয়ার পিছনে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে?  যতটুকুই বাস্তবায়িত হয়ে থাকুক না কেন, চুক্তির সুফল কারা বেশি ভোগ করছে, পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ীরা না বাঙ্গালীরা?

৫। বাংলাদেশের কোনো সরকার স্বপ্রনোদিত হয়ে, পাহাড়ে অশান্তি বাড়ানোর জন্যে কখনো কিছু করেছে ? নাকি, এই যে সেনা-সেটেলারকে দায়ী করেন – এরা পাহাড়ের কিছু নেতার ব্যক্তি স্বার্থ, অদূরদর্শিতা আর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের প্রতিক্রিয়ায়  সময়ের প্রয়োজনে কোন বিকল্প ছিল না বিধায় ঘটেছে?

৬। নিজেই চেষ্টা করুন তো, মুখের একটা কথার অপপ্রচার ছাড়া বঙ্গবন্ধুর আমলে গৃহীত অন্তত একটি পদক্ষেপ বের করতে পারেন কিনা – যা শান্তি বাহিনী গঠন সমর্থন করে। একটা পদক্ষেপও পাবেন না। 

এম এন লারমার মত একজন প্রজ্ঞাবান নেতা যদি নব্য স্বাধীন একটা দেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে না নিয়ে বাংলাদেশকে আরেকটু সময় দিতেন, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে আজকের এই অশান্তির কতটা থাকত?

অনেকেই এম এন লারমা  কর্তৃক সংসদে দাবী তোলা এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা বলেন। শান্তি বাহিনী যদি ১৯৭৫ সালের পরে সৃষ্টি করা হতো, কিংবা নিদেনপক্ষে ১৯৭৩ সালের পরে; তাহলেও বলা যেত যে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের চেষ্টা ছিল। বরং তৎকালীন ঘটনার প্রেক্ষাপটে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বন্দুকের নলের উপরেই এম এন লারমার বেশি বিশ্বাস ছিল, তাই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের  আড়ালে একেবারে শুরু থেকেই সশস্ত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। যে প্রস্তুতির সমাপ্তির পরেই অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়, সরকারী বাহিনীর উপর আক্রমনের মধ্য দিয়ে।

 
আরেকটা বিষয় আমার চোখে পড়েছে।
সেটা হল, গুটি কয়েকজনের অপকর্মকে ফলাও করে প্রচারের পাশাপাশি বাঙালীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কটুক্তি করা।

কারো চোখে যখন রঙ্গিন চশমা থাকে, তখন সে যদি সব কিছুকে রঙ্গিন দেখবে  – এটাই স্বাভাবিক। তাই বাস্তবতার সাথে তার দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্যের জন্যে তাকে কেউ যদি দায়ী করতে চায়, খুব একটা ভুল হবে বলে মনে করি না।

একটা জোকস প্রচলিত আছে, হয়ত জানেন। 
ভোরে এক হুজুর মসজিদের পুকুর ঘাটে অজু করছে, নামাজের জন্য। একই সময়ে পুকুরের অন্য পাড়ে, আরেকজনকে হাত মুখ ধুতে দেখে হুজুর মনে মনে ভাবছে, ঐ লোকটাও হয়ত নামাজের জন্য এসেছে, তাই তার মত অজু করছে। 
অথচ, ঐ লোক ভাবছে, ঐ ঘাটের লোকও মনে হয় তার মত একজন চোর, সারারাত চুরি করে এখন বাড়ি ফেরার আগে একটু পরিষ্কার হয়ে নিচ্ছে। 

আরেকটা বিষয় হয়ত খেয়াল করেছেন। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একজন রাস্তার পিচের কন্ডিশন দেখে ভাবে এই রাস্তায় কি পরিমাণ খরচ হয়েছে, কারণ সে পেশায় কন্ট্রাক্টর, রাস্তার নিরমান/মেরামতের কাজ করে। অন্যজন মোবাইলের দোকানে কাস্টমারের ভিড় কিরকম, সেটায় নজর দিচ্ছে। কারণ, সে মোবাইল ব্যবসায়ী – এখানে মোবাইলের দোকান খুললে ব্যবসার সম্ভাবনা বুঝার চেষ্টা করছে। এমন, অনেক বলা যাবে। যার আগ্রহ খাবারে, সে হয়ত খাবারের দোকানের দিকে মনোযোগ দিবে। 
মুলত, আমরা সেই বিষয়গুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করি যেগুলোতে আমাদের আগ্রহ আছে। 

অনেকেই শুধুমাত্র অন্যায়গুলোর উদাহরণ টেনে বাঙ্গালীদের যে চারিত্রিক বৈশিস্ট উল্লেখ করেন, তার জন্য তাদেরকে দোষ দিব না। আমি পাহাড়িদের এ ধরনের বা এর চেয়ে জঘন্য অনাচারের উদাহরণ আছে কিনা, সে প্রশ্নও তুলবো না। এটাও বলব না যে, দুনিয়ার অন্য কোন দেশে বা জাতিতে এ ধরনের অপরাধ হয় কিনা। 

শুধু বলব – যারা বাঙালীদের চরিত্রে কালিমা লেপন করতে গিয়ে অতি নগণ্য পরিমানের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে ফলাও করে প্রচার করার মাধ্যমে তাদের নিজেদের যে  মনোভাবের যে প্রকাশ ঘটিয়েছে, তাতে কিন্তু এটা পরিস্কার – তারা নিজেরা কেমন প্রকৃতির মানুষ বা তাদের মনোযোগ কোন দিকে।

তাই, আমরাও চাই না এমন প্রকৃতির মানুষরা বাঙালি হয়ে আমাদেরকে কলুষিত করবেন।
বরং আমরা চাই, সবাই নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে শান্তিতে বসবাস করুক।

“সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক”

What do you think of this post?
  • Like (0)
  • Awesome (0)
  • Interesting (0)
  • Boring (0)
Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
3

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *