ফেসবুক প্রেম

অস্বাভাবিকহারে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পেয়ে অবাক না হয়ে উপায় ছিল না।

বোঝার শতচেষ্টা করেও প্রকৃত কারণ বের করতে পারিনি। অনেকগুলো অপশন পর্যালোচনা করে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য  অনুমিত যুক্তি হিসেবে – প্রোফাইলের ছবিটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে নিজেকে বোঝালাম। যদিও ছবিটাতে অসাধারণ কিছুই ছিল না।

ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এর পাশাপাশি মেসেঞ্জারে মেসেজ পেতে শুরু করেছি, মোসুমী বৃষ্টির মত অবিরাম। যার প্রায় শতভাগই  চিরাচরিত কপি-পেস্ট টাইপের মেসেজ – হাই, হ্যালো, হাই বিউটিফুল বা কেমন আছো, আপনার হাঁসিটা সুন্দর বা আপনার ছবিটা সুন্দর হয়েছে –  দিয়ে শুরু হয়। কোনভাবেই আমার  মাথায় আসে না, কতটুকু নির্বোধ হলে, একজন আশা করে যে, সম্পূর্ণ অপরিচিতা একজনকে এমন একটা মেসেজ দিলেই মেয়েটি তার বন্ধুত্বের আহবানে সাড়া দিবে!

কয়েকজন আবার স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সদ্ব্যবহার করে  সরাসরি ভিডিও কল করে বসে। অনেক ক্ষেত্রেই এদের কমনসেন্স আর  কল করার সময়জ্ঞানের দুর্ভিক্ষাবস্থা  দেখে যতটা না বিরক্তি বা করুণার উদ্রেক হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশী রাগ আর ঘৃণা সৃস্টি হয়েছে এই সকল অর্বাচীনদের প্রতি।

আমার ফেসবুকের স্বল্প অভিজ্ঞতায় প্রতিদিন প্রায় গোটা বিশেক নতুন মেসেজ পাচ্ছি। অন্যদের কথা বলতে পারছি না। তবে আমি কম অভিভূত হইনি, আমার এই অকস্মাৎ জনপ্রিয়তা অর্জনে। দু একবার ভয় হচ্ছিল, কোন কাঙ্গালী বাবু আবার আমাকে শ্রীযুক্ত দুকড়ি দত্ত উকিলের মত খ্যাতির বিড়ম্বনায় ফেলে দিলো কিনা!

এর মধ্যেও আজাদের মেসেজটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। মেসেজের বক্তব্যে আমার গাঁ রীতিমত শিউড়ে উঠে – আমার ইমেইল থেকে তার কাছে  মেইল পাঠানো হয়েছে, যেখানে আপত্তিকর কনটেন্ট আছে। চেক করে দেখলাম, ইমেইল এড্রেসটা আমারই। তবে, এটা রেগুলার ইমেইল হিসেবে ব্যবহার করি না। শুধুমাত্র, সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্যান্য সাইট সাবস্ক্রাইব করার জন্যে ব্যবহার করি।

আমার মেইলটা পেয়েই সে বুঝেছিল যে, আমার আইডি হ্যাক হয়েছে। তাই, ফেসবুকে আমাকে খুঁজে বের করে, মেসেজ পাঠিয়েছে। এমন উদ্যোগ কখনো আশা করিনি, তাও আবার সম্পূর্ণ অপরিচিত একজনের কাছ থেকে।

ধন্যবাদ দিয়ে মেসেজ পাঠানোর পরে বেশিক্ষন দেরী হলোনা, তার ফিরতি মেসেজ পেতে। এভাবে কয়েকটা মেসেজ আদান-প্রদান করেই বুঝে ফেললাম যে, সে ফ্রেন্ডলি, সবসময় হালকা ফান করতে পছন্দ করে এবং গুরুত্ব সহকারে কোন কিছু নেয় না।

কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে, তার ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুঁ মেরে উল্লেখযোগ্য কিছু পেলাম না। তার বয়সী তরুণেরা যেভাবে পোজ দিয়ে সেলফি তুলে, তেমন একটাও নেই। অল্প কিছু ছবি আছে, যার কোনটাই ঠিকমতো তোলা হয়নি। কেমন একটু হাবাগোবা টাইপের, লিকলিকে এক ছেলে – দেখে মনে হচ্ছে না এটা কোন ভার্সিটির ছাত্র হতে পারে। মোদ্দা কথা, পোশাক-আশাক, হেয়ার স্টাইল এমনকি ছবির সাথের মানুষদের দেখেও ইমপ্রেস হওয়ার মত কিছু খুঁজে বের করতে পারলাম না।

আকর্ষণীয় কোন কিছু না দেখলেও তার সাথে মেসেঞ্জারে চ্যাটিং অনেকটা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। এর পিছনে তার হালকা ফানগুলোর যথেষ্ট অবদান আছে। এছাড়াও কথাবার্তায় তাকে কেন জানি নির্লোভ মনে হয়েছে। যে গুণটি আমাকে সবচেয়ে বেশী আকর্ষণ করেছে, সেটি হল  – তার কোন দুর্বলতা আড়ালের চেষ্টা করছে না এবং আমাকে ইমপ্রেস করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ চোখে পড়েনি।

স্বাভাবিকভাবেই মোবাইল নাম্বার আদান-প্রদানে সময় লাগলো না। মাসখানেকের মধ্যেই ঠিক হয়ে গেল – দেখা করবো। দেখা করতে রাজী হওয়ার পিছনে দুজনেই  একই শহরের বাসিন্দা হওয়া ছাড়াও আমার নিজের কৌতূহলও দায়ী। বস্তুত, অনেকগুলো জিজ্ঞাসা আমাকে প্রতিনয়ত কুরে কুরে খাচ্ছিল।

অপরিচিতা একজনের মেইল হ্যাক হয়েছে দেখে তাকে খুঁজে বের করার এই প্রচেষ্টার পিছনে আসলে কী আছে ?
এই বয়সী একজন তরুণ এতটা নির্লোভ আর নির্মোহ আচরণ কিসের জোরে করতে পারে?
নিজের উপর তার এমন আত্নবিশ্বাস কেন?

দেখতে দেখতে দেখা করার দিন ঘনিয়ে এল। আমার ভিতরে বিন্দুমাত্র টেনশন কাজ করছে না, পেটের ভিতরে কোন প্রজাপতিও  উড়ছে না। আজাদকে মুগ্ধ করার কোন প্রকার ইচ্ছা বা আকাংখা অনুভব করছি না। অন্যান্য দিনের মতই সাদামাটা একটা ড্রেস পড়ে ক্লাশে চলে গেলাম। ক্লাশ শেষে হাতিরপুলে বাসায় ফেরার পথে নিউ মার্কেট থেকে কয়েকটা টুকটাক জিনিস মা কিনতে বলেছিল। সেগুলো কেনার সময় তার সাথে দেখা করার প্ল্যান করি।

ইচ্ছে করেই, তাকে অপেক্ষায় রেখে একটু দেরীতে হাজির হই, যথাস্থানে। খাবার দোকানের সামনে বসে থাকা লোকদের উপর নজর বুলিয়ে, কঙ্কালসার চ্যাংড়া গোছের কাউকে না দেখে এবার আশে পাশের লোকজনের দিকে তাকাই। আজাদের মত কাউকে না দেখে, কিছুটা নার্ভাস ফিল করে নিজেকেই ধিক্কার দেই – কেন যে এত তাড়াতাড়ি রাজী হয়েছিলাম দেখা করতে।

– এক্সিউজ মি, আপনি নিশ্চয়ই, শায়লা? আমি আজাদ।

আমার সামনে সুঠামদেহী, পরিপাটী বেশভূষার স্মিতহাস্য মুখের এক তরুনকে দেখে মুহূর্তের জন্যে হলেও আমার হার্টবিট বেড়ে যায়।

কিভাবে সম্ভব! কোন দুঃখে এমন একজন মানুষ, বয়ঃসন্ধি পেরোনো এক ছ্যাবলা মার্কা তরুনের ছবি ফেসবুকে পোষ্ট করবে ?

বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে বসে, কথা বলতে বলতে জানতে চাইলাম, কেন সে এমন ছবি ফেসবুকে দিয়ে রেখেছে।

– আমার আসলে বেশী ছবি নেই। তাই কিছু পুরনো ছবি দেয়া রয়েছে। মনে হয় কিছুটা চেঞ্জ হয়েছে, আমার, তাই না?

আজাদের এই ‘কিছুটা’ বলতে নিয়মিত জিমে গিয়ে বানানো বডি বিল্ডারের মত একটা ফিগার নির্দেশ করছে। আমি বলার কিছু খুঁজে পাই না। সে কি আসলেই জানে না যে, তার পরিবর্তন কতটা হয়েছে? নাকি সে এসবের থোরাই কেয়ার করে!

এরপরে তার সাথে আরো অনেকবার দেখা হয়েছে।  সব কিছুর ঊর্ধ্বে, তার মানবিক গুণাবলী ছিল অসাধারণ। প্রকৃত মানবিক গুনসম্পন্ন যে ধরণের মানুষ আমি মনে মনে খুঁজছিলাম, সে ছিল তেমনি একজন। তার সাথে কাটানো সময়গুলো আমি সবসময় উপভোগ করতাম। তার ভিতরের গুণাবলীগুলোই তাকে বাইরে এতটা নিখুত একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

বলতে দ্বিধা নেই যে, আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম।

(২)

সবকিছুই খুব হালকা ভাবে নেওয়ার স্বভাবের সাথে আমি ইতোমধ্যেই পরিচিত হয়ে পড়েছি। তাই, আজাদকে কিছু বলতে সাহস পাইনি। যতবার ভেবেছি, তাকে সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করব, ততবার মনে হয়েছে, যদি সে আমাকে ফিরিয়ে দেয় ! প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বেদনা সহ্য করার মত শক্তি আমার আর অবশিষ্ট নেই।

আমাদের নিয়মিত দেখা হওয়ার সুযোগ ক্রমাগত কমতে কমতে, বছর তিনেকের মধ্যেই প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। যোগাযোগ মূলত সোশ্যাল মিডিয়া আর ফোনালাপে সীমাবদ্ধ এখন । বেসরকারী এক চাকরী পেয়ে, আজাদ দেশের এক প্রান্তে চলে গেছে। এখনো তার সাথে কথা বলার সময় তার চারিত্রিক মাধুর্য আমি অনুভব করতে পারি।  তার কন্ঠস্বর  আমার পেটের ভিতর নানান রঙয়ের  প্রজাপতি উড়িয়ে দেয়, আমার হার্টবিট মিস হয়ে যায়। কিভাবে কিভাবে যেন আমার সমস্ত অনুভূতি তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে শুরু করেছে। যখনই তার কথা ভাবি, মধুর স্মৃতিগুলো ফিরে আসে। কিন্তু মুখ ফুটে ভালোলাগার কথাটি বলার সাহস এখনো সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি।

আমিও চাকরীতে জয়েন করেছি, ইতোমধ্যে। প্রতিদিন অফিসের মাইক্রোতে উত্তরা যাতায়াত করতে হয়। অবধারিতভাবেই অন্য যাত্রীদের সাথে কয়েকদিনের মধ্যেই পরিচিত হতে হল। হাজার হলেও একই গাড়ীতে প্রতিদিন অফিসে যাচ্ছি – অন্তত দিনে দুইবার দেখা হয়। তন্মধ্যে একজনকে একটু বেশী বন্ধুবৎসল মনে হল। তিনি বাংলামোটর থেকে উঠেন, আমার চেয়ে দুই বছরের সিনিয়ার, আরেকটা ডিপার্টমেন্টে বসেন।

কর্পোরেট কালচারের কথা মাথায় রেখে, ওমর ভাইয়ের সাথে আলাপচারিতা  কলিগসুলভ কথাবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সম্পর্কটা বন্ধুর মতো হলেও একেবারে নিখাদ বন্ধুত্ব নয়। কথার ঢংয়ে আন্তরিকতা যথেষ্ট থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবধানের একটা সুক্ষ রেখা দৃষ্টির আড়ালে তার উপস্থিতি বজায় রাখে সদর্পে। আমিও নিজেকে কখনোই পুরো উজাড় করে দেওয়ার ঝুঁকি নেই না। বরং কিছুটা রিজার্ভ থাকার চেষ্টা করি।

ফেরার পথে প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। অন্যান্য দিন এইরকম জ্যামের ভিতরেই ধীরে ধীরে গাড়ি এগুতে থাকে। কিন্তু আজ গাড়ী একদমই এগুচ্ছে না। কালবৈশাখীর পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে, ঝড়ের সাথে হালকা বৃস্টিও শুরু হয়েছে। বাতাস সামলানোর পাশাপাশি, ফুটপাতের দোকানদারেরা বড় বড় পলিথিন দিয়ে তাদের পসড়া ঢেকে দেয়ায় ব্যস্ত। চরম বিরক্তি আর দিনশেষের ক্লান্তি নিয়ে মাইক্রোতে বেশীরভাগই ঝিমুচ্ছে। শুধু ফোন বাজলে, কথা বলছে। না হয়, কেউ কোন কথাও বলছে না।

উদ্দেশ্য কি ছিল ? এখন আর মনে করতে পারছি না । মাইক্রোর ভিতরের বিরক্তিকর পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়া, নাকি বাইরের খোলা বাতাসের স্বাদ আস্বাদন করার  আকাংখা – তবে কি মনে করে, ওমর ভাইয়ের কফি খাওয়ার প্রস্তাবে রাজী হয়ে, গাড়ী থেকে নেমে বুনো বাতাস আর হালকা বৃস্টির মধ্যেই প্রায় দৌড়ে এক কফিশপে ঢুকে পড়ি।

কাঁচের ভিতর বসে বাইরের বৃস্টি দেখতে ভালো লাগছিল। অফিস ডেতে এই সময়ে কফি শপে সময় কাটানোর মত বিলাসিতা করার মত লোক কমই আছে। তাই কফি শপটা প্রায় ফাঁকা বলা যেতে পারে। দুজনে যতটা না কথা বলছি, তার চেয়ে বেশী নিঃশব্দে বাইরের বৃষ্টিবিঘ্নিত দৃশ্য উপভোগ করছি। কফি খাওয়াটা যেন এখানে বসে থাকার  একটা অজুহাত মাত্র, নিঃশব্দে সময় কাটানোটাই মুখ্য উদ্দেশ্য।

নিয়মিত বিরতিতে আমরা বিভিন্ন কফি শপে ঢু মারতে শুরু করলাম। এর পিছনে ঢাকা শহরের জ্যামকে বাহ্যিকভাবে দায়ী করলেও, আসলে আমাদের আড্ডা উপভোগ্য হওয়ার বিশাল ভূমিকা রয়েছে। মাঝে মাঝে আমাদের সাথে আরো দু-একজন জয়েন করত। এমনকি বিশেষ কোন কফি শপে যাওয়ার পূর্ব পরিকল্পনা থাকলে, ঐ এলাকার কাছাকাছি কেউ কেউ আমাদের সাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে বাসায় ফিরত। আড্ডায় বাকী সবাই বদল হলেও আমি আর ওমর ভাই ছিলাম কমন ফিগার।

সমস্যার শুরুটা হলো অন্য জায়গায় – যা আমার মাথায় কখনই আসেনি। যেসব কলিগ আমাদের দুজনকেই চিনে, তারা আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে সন্দেহ করতে শুরু করল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কানাঘুষা এমনকি দু’একটা গুজব পর্যন্ত চাঊড় হয়ে গেল। তবে, সবই ছিল আড়ালে- আবডালে।

আমি আর ওমর ভাই এগুলো পাত্তা না দিয়ে , আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছি। বলা যায়, আমার সম্পর্ক আরো শক্ত হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝেই অফিস থেকে ফেরার পথে একত্রে সময় কাটাই। গল্পের মধ্যে বই, সিনেমা থেকে শুরু করে অন্যান্য অনেক বিষয়ই চলে আসে। আমাদের দুজনের মধ্যেই প্রচুর মিল খুঁজে পাই – দুজনই কিছুটা অন্তর্মুখী, ভিড় আর হৈ-হুল্লোড় অপছন্দ করি। যে কোন আড্ডায়, সবাই যখন কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, শুধু আমরা দুজন তখন চুপ করে শুনতে থাকি। দুজনেই বই পড়তে পছন্দ করি আর গানের পছন্দ প্রায় কাছাকাছি ধরণের। ছোট ছোট কিছু ঘটনার পরে, তার প্রতি আমার বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা আরো বেড়েছে।

কয়েক  মাস পরে, আবার সেই প্রথম কফি শপে এসেছি, শুধু আমরা দু’জন। কারণ, অন্য কেউ গাড়ি থেকে নামেনি, আমাদের সাথে। এবারও ভিড় নেই, বরং প্রায় খালি বলা যেতে পারে।

– তুমি খুব ভালো একজন মেয়ে। তোমাকে স্ত্রী হিসেবে পাওয়া নিশ্চয়ই যে কারো সৌভাগ্যের ব্যাপার।

স্থান-কাল-পাত্র ভুলে সশব্দে হেঁসে উঠি। এমন কিছুর জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমার ফ্রেন্ডলি আচরনের কারণে অনেকের সাথেই আমার এক ধরণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। দু-একজন এমন কথা এর আগেও বলেছে। তবে, কখনই তাদের কথা সিরিয়াসলি নেইনি। সত্যি বলতে কি, তাদের অন্তরের মুগ্ধতার চেয়ে চোখের জৈবিকতার শিখা বেশী জাজ্বল্যমান ছিল – যা  আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। কিন্তু আজ, আমি ওমর ভাইয়ের অন্তরের মুগ্ধতা অনুভব করতে পারছি।

– তুমি কারো সাথে প্রেম করছো না কেন ?

– আপনি কিভাবে শিওর হলেন, আমার সাথে কারো প্রেমের সম্পর্ক নেই ?

– আমি জানি।

আমি জানি, আমি অতীব সুন্দরী নই। তারপরেও তার আত্নবিশ্বাসী কন্ঠ আমার কাছে ব্যঙ্গাত্নক মনে হল। চেহারায় ফুটে উঠা হালকা অপমানিতবোধের অভিব্যক্তি আড়াল করতে ব্যর্থ হলাম।

আমাকে সম্পূর্ণ রূপে অপ্রস্তুত করে দিয়ে, ওমর ভাই আমাকে প্রপোজ করলেন। তার কথায় চমকে গিয়ে কখন যে উঠে দাঁড়িয়েছি, আমি নিজেও জানি না। আমার এমন প্রতিক্রিয়া যে কল্পনাও করেনি, তার চোখে চোখ পড়তেই বুঝে ফেললাম। ক্ষণিকের  মধ্যেই আমারও সংবিৎ ফিরে এল।

কাঁচের বাইরের দুনিয়ায় প্রস্থানোদ্যত বর্ষার  হালকা বৃষ্টির মুগ্ধতার মধ্যে এক কফিশপে আমার ভিতরে বর্ণনাতীত ভালোলাগার এক স্বর্গীয়  অনুভূতি অনুভব করতে বিলম্ব হল না। কারণ, এর আগে আমাকে কেউ কখনো প্রপোজ করেনি। কিন্তু আমার হৃদয়তো অনেক আগেই আজাদের কাছে হারিয়ে ফেলেছি। তাই, খুব বিনয়ের সাথে তাকে বললাম,

– আমি আরেকজনকে ভালোবাসি। আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, যদি অসচেতনভাবে কোন আচরনে আপনাকে কোন ধরণের ইন্ডিকেশন দিয়ে থাকি যে, আপনার প্রতি আমার বিশেষ ফিলিংস আছে।

ওমর ভাইয়ের চোখে পানি দেখে আমার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বেদনা কেমন – তা আমি জানি। দু’বার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে বলে, আমি এখন পর্যন্ত সাহস করে আজাদকে কিছু বলতে পারিনি। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললাম,

– আমাকে মাফ করবেন, প্লীজ। আশা করছি, আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে না, আজকের পর থেকে।

ওমর ভাইয়ের অনুরোধে, আরো কিছুক্ষণ বসে, তারপর আমরা উঠে পড়লাম।

একদিকে আমার জীবনের কৈশোর থেকে লালিত একটা স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। অবশ্যই এটি ছিল জীবনের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু ঘটেছে ভুল মানুষের সাথে, অসময়ে।  আমি তাকে যতটা না ফ্রেন্ড তার চেয়ে বেশী কলিগ হিসেবেই বিবেচনা করি। অথচ, তিনিই আমার স্বপ্নপূরণে এগিয়ে এসেছিলেন।

আশ্চর্যের ব্যাপারটা হল – কেন যেন আমার অসম্ভব ভালো লেগেছিল। নিজেকে অসম্ভব সুখী ভাবছিলাম , দুনিয়ার সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী নারী  মনে হচ্ছিল – ঐ মুহূর্তে। পরক্ষনেই এক অসহনীয় বেদনা আমাকে ঘিরে ধরেছিল, আষ্টেপৃষ্ঠে। এই অনুভুতি আমি বলে বোঝাতে পারব না। লিখে ব্যক্ত করার তো প্রশ্নই উঠে না। মানুষের অনুভূতিগুলো আদতে বর্ণহীন হয়। আর বলাই বাহুল্য যে, কিছু বর্ণ সুন্দরভাবে বিন্যাস করে সব অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার সামর্থ্য অন্তত আমার নেই।

(৩)

তার ব্যস্ততা না আমার – আমি বলতে পারব না। তবে আজাদের সাথে এখন কথাবার্তা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। আসলে, দিনে দিনে আমাদের কথা বলার ফ্রিকোয়েন্সি একটু একটু করে  কমছে। কথা কমে গেলেও সে এখন মাঝে মাঝে বলে যে, সে আমাকে প্রচন্ড মিস করে। কখনো কখনো আমি ফিল করি, সে হিন্টস দিচ্ছে – সে চায় আমরা একত্রে থাকি। তার কণ্ঠস্বর, কথা বলার স্টাইল আর কিছু কিছু শব্দের ব্যবহারে পরিস্কার ইঙ্গিত রয়েছে, আমার প্রতি তার যে ভালোবাসা রয়েছে তা শুধু  নিরেট বন্ধুত্ব বা নিঃস্বার্থই নয় বরং তার চেয়েও বেশী কিছু। আমি নিশ্চিত, সে আমাকে ভালবাসে। শুধু মুখ ফুটে বলার অপেক্ষা।

আজাদের সাথে আমার কথা বলা যতটা কমতে থাকল, আমার প্রতি তার টান যেন ততটাই বাড়তে লাগল। অন্যদিকে, ওমর ভাইয়ের সাথে আমার সময় কাটানো ধীরে ধীরে বাড়ছে। সপ্তাহে প্রায় ৫ দিনই অফিস শেষে আমরা একত্রে সময় কাটাতে শুরু করেছি। নিজেই অবাক হয়ে দেখছি যে, ওমর ভাইয়ের সাথে সময় কাটানোর জন্যে আমি এখন অপেক্ষায় থাকি। বাইরের আড্ডা এখন স্মার্টফোনের বদৌলতে বাসায়ও প্রবেশাধিকার অর্জন করে ফেলেছে।

আমি অনুভব করতে পারছি যে, ওমর ভাইয়ের প্রতি  আমার দৃষ্টিভঙ্গি এখন আর আগের মত নেই।  তাকে এখন অনেকটা ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখি,  কলিগের চেয়ে বেশী কিছু।  তার সংস্পর্শে আমি অনেক মানসিক শক্তি অনুভব করি। দিনে দিনে তাকে আমার পারফেক্ট মনে হয়। আজাদের কথা সম্পূর্ণটা জেনেও বিন্দুমাত্র রাগ করেন নি। তবে, তার চোখে ক্ষণিকের জন্য হলেও হতাশার ছায়ার আগমন আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। আজাদের  প্রতি আমার ফিলিংস এবং তার ব্যাপারে সমস্ত কিছু জানার পরেও আমার সাথে আচরণে কোন পরিবর্তন না হওয়াতে ওমর ভাইয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরক ধাপ বেড়েছে। অন্যদিকে, আমার হৃদয়ের চারপাশে আগে যে চীনের প্রাচীরের মতো দুর্ভেদ্য দেয়াল ছিল, তা যেন ক্রমেই তার অলঙ্ঘনীয় বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে।

এর মধ্যে আজাদ ছুটিতে এল। ঢাকা এলেই  আজাদ আরো কয়েকজন ফ্রেন্ডসহ আমার সাথে আড্ডায় সময় কাটাতো। আগের মতই, ছাত্রাবস্থায় যেমন হত। দেখা হলেই আমার মধ্যে পুরনো উষ্ণতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর বন্ধুত্ব মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠে। এবারেও সেই আগের মত উত্তেজনা আর আবেগ অনুভব করলাম।

কয়েকদিন পরেই তার বোনের বাসায় আমাকে দাওয়াত দিল। উদ্দেশ্য, ছুটিতে থাকতে থাকতে সে আমাকে তার পরিবারের সদস্যদের সাথে পরিচিত করিয়ে দিতে চায়। দুপুরে কিছুটা মার্জিত সাজগোজের মধ্যেই সালোয়ার কামিজ পড়ে দেখা করতে গেলাম। যতক্ষণ বাসায় ছিলাম, বার বার মনে হচ্ছিল  তারা আমাকে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করছে।  আন্টির চোখেও প্রত্যাশিত গ্রহণযোগ্যতার ছায়া লক্ষ্য করলাম না।

পরেরদিন দেখা করলাম,অফিস শেষে সোজা ক্যাম্পাসে, পুরনো আড্ডার স্থানে। আজাদকে অনেক উচ্ছসিত দেখাচ্ছিল। সে জানাল যে, তার মা আমাকে পছন্দ করেছে। আমি যেন আমার ফ্যামিলিতে তার ব্যাপারে কথা বলি। তার কাছে থেকে আরো জানতে পারলাম, হলুদ রং আমাকে তেমন মানায় না।

– কেন ?

– মা বলেছে যে, ডার্ক কালারের ড্রেসে আমাকে বেশী মানায়। হলুদ রঙয়ে আমাকে কম ফর্সা দেখায়।

কথা প্রসঙ্গে জেনে গেলাম, কালো ড্রেস পড়া একটা ছবি সে  আন্টিকে দেখিয়েছিল। সে আমার কয়েকটা ছবি তুললো, আন্টির জন্যে।

কোথায় যেন পড়েছিলাম, তাকেই বিয়ে কোরো, যে তোমাকে ভালবাসে। তাকে নয়, যাকে তুমি ভালবাস। এখন, আমি কার প্রতি হাত বাড়িয়ে দিব?

ভেবে ভেবে কূল পাচ্ছিনা।

 

 

What do you think of this post?
  • Boring (1)
  • Like (0)
  • Awesome (0)
  • Interesting (0)
Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
12

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *