ফাগুণের উষ্ণতা

রিক্সায় উঠে বসেই জয়ীতা জিজ্ঞেস করল,

-কীরে! যা চাইল, তাতেই রাজী হয়ে গেলি? এত বেশি ভাড়া চাওয়ার পরেও তুই কিছুই বললি না!!

নিজেকে একটু এডজাস্ট করে বসতে বসতে উত্তর দিলাম,

– দেখছিস না, ভিড়ের কারণে কেউ যেতে চাচ্ছে না, ঐদিকে।

যদিও মাত্র দুইজন রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করার পরেই আমরা রিক্সা পেয়ে গেছি। সত্যি কথা বলার মত সাহস নেই বলেই মুখে এ উত্তর দিলেও, মনে মনে বলছি,

-তোর সাথে এক রিক্সায় চড়ার সৌভাগ্যের বিনিময়ে আমি আরও অনেক কিছু দিতে রাজী আছি।

বাসন্তি রঙের শাড়ী পড়ে এক সেলফি তুলে পাঠিয়েছিল, দুপুরের পরপরই। তখন থেকেই অপেক্ষা করছিলাম, জয়ীতাকে কাছে থেকে দেখার আকাংখায়। তাই হলের গেট থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে, তাকে দেখে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম। সামনাসামনি হওয়া মাত্রই আমার পেটে সেই পুরনো অনুভুতি মাথা চাঁড়া দিয়ে ওঠে, প্রথম দেখায় যা হয়েছিল। অথচ, তার সাথে পরিচয় এখন প্রায় তিন বছর হতে চলল। এই সময়ে দুজনের জীবনে অনেক কিছু ঘটলেও সম্পর্কের স্ট্যাটাসে কোন পরিবর্তন হয়নি। ক্লাসমেটের চেয়ে আরেক ধাপ উপরে,  বন্ধুত্বের চেয়ে কিছুটা বেশি – যদিও ‘ফিলিংস আর মিউচুয়াল’ তত্ব অনুযায়ী  পরস্পরের প্রতি অদৃশ্য আবেগের উপস্থিতি সব সময়ই টের পায় আশে-পাশের সকলেই। 

রিক্সা চলতে শুরু করেছে। আমি জয়ীতার শরীরের কোমলতা আর উষ্ণতার পাশাপাশি তার শরীরের একটা মিষ্টি সুগন্ধ উপভোগ করতে শুরু করেছি। ভাঙ্গা রাস্তার সুবাদে ছোট খাটো কয়েকটা ঝাঁকি, আমার জন্যে আরো সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আসছে। এরই মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে মনের ভিতরে – মনের একাংশ চাইছে তার হাত ধরতে, আরেকাংশ নিষেধ করছে। মন একবার বলছে, হাত প্রসারিত করে তাকে ধরে আরো কাছে টেনে নিতে; পরক্ষনেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, কাজটা কিন্তু ঠিক হবে না। মনে মনে খুব করে চাইছিলাম, রিক্সার ঝাঁকিতে পতন ঠেকানোর উদ্দেশ্যে হলেও জয়ীতা যদি আমার হাত ধরত !! মন চাইছিলো, তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলি

–  তাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে, আর এমন একটা রিক্সা ভ্রমনের সুযোগ পেয়ে আমি মহাখুশি। 

নীলক্ষেতের সিগন্যালে অল্পের জন্যে পার পেলাম না, আটকে গেলাম। রিক্সায় বসে আশে পাশের মানুষের ব্যস্ততা দেখছিলাম। তার মধ্যেও কয়েকজনের চকিত দৃষ্টি নজর এড়ালো না। তাদের চোখে  মুগ্ধতার ছায়া দেখে জয়ীতার পাশে বসে নিজেকে আরো সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। কিছুটা গর্বিতও বটে। মেক আপ ছাড়াই জয়ীতাকে আমার কাছে অসাধারণ লাগে। অন্য সকলের কাছে অসাধারণ মনে হবে কিনা জানি না,  তবে সুন্দরীদের কাতারে ফেলে দেয়া যাবে, এক নজরেই।

ঢাকা ভার্সিটিতে ঢোকার মুহূর্তে আবার সিগন্যালে পড়লাম। আসলে ১লা ফালগুণের কারণে জনস্রোত ছুটছে বই মেলায়। তাই, রাস্তার ট্র্যাফিক জ্যামের পাশাপাশি ফুটপাতভর্তি মানুষ, বেশির ভাগই তরুণ-তরুণী। আর তরুণীদের অনেকেই বাসন্তী রঙের শাড়ী পড়া, এমনকি মধ্যবয়সী নারীরাও আক্রান্ত হয়েছে এই ফাল্গুনী জ্বরে। কে যেন বলছিল, ঢাকা শহর দিনে দিনে উৎসবের শহরে পরিণত হচ্ছে, কোন না কোন উপলক্ষ উদযাপনের দৃশ্য কিছুদিন পর পরই চোখে পড়ে। এখন আমারও তাই মনে হচ্ছে।

ঘড়ির কাটায় অপেক্ষার পালা দীর্ঘক্ষণ দেখালেও আমি মনে মনে খুশী হচ্ছিলাম। যত বেশি জ্যাম, তত বেশি সময় জয়ীতার পাশে বসে থাকার সুযোগ। ঐ মুহূর্তে মনে হচ্ছিল,  আমি একা নই, ঢাকা শহরের জ্যামের উপর খুশী হচ্ছে আরো অনেকেই। এমনকি তাদের বেশিরভাগই রয়েছে, আমার আশেপাশেই।

দুপুরের পর থেকে আকাশে হালকা মেঘ থাকলেও এখন হঠাৎ করেই আকাশ কালো হতে শুরু করেছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই এক দমকা  শীতল বাতাস বুঝিয়ে দিয়ে গেল যে, কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখন জ্যামের চেয়ে মেঘের ঘনঘটা বেশি, শুধু বৃষ্টি নামার অপেক্ষা। ফুটপাতে পায়ের কদমের গতি এখন অনেক বেশি, কারো কারো কদমে দৌড়ের ছন্দ ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এবারের  বৈশাখী ঝড় কি ফাল্গুনেই শুরু হতে চলল, তাহলে ! 

এফ রহমান হল পার হতে না হতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। রিক্সাওয়ালা আমাদের কোলের উপর পলিথিন ঢেকে দিল, পলিথিনের দুই কোনা আমরা দুজনে ধরলাম। আড়চোখে তাকিয়ে তাকে দেখার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা খেলাম কয়েকবার। তাই, এখন সামনের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনছি, যার বেশীরভাগেই আমাকে বিভিন্ন কারণে দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে। আমিও চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী, অতীব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে যাচ্ছি। 

ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে, এখন। রিক্সার গতি মন্থর। তবে, বৃষ্টির তোড় অনেক বেশি, রীতিমত ভরা বর্ষার বৃষ্টি যেন। অথচ আমরা কেবল ল্যাবরেটরী স্কুলে কাছে। বাতাসে রিক্সার পলিথিন দুয়েকবার উড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। তবে, আমাদেরকে ভিজিয়ে দিতে ব্যর্থ হলো না মোটেও।  দুজনের কেউই এখন আর কোন কথা বলছি না। যতটুকু কাছাকাছি হওয়া সম্ভব, ততটাই কাছাকাছি, গা ঘেঁষে, চুপচাপ বসে আছি। জামা-কাপড়ের উপর দিয়েই পরস্পর পরস্পরের শরীরের উত্তাপ অনুভব করছি। হালকা ভেজা কাপড়ে দেহের উষ্ণতার আবেদনকে আরো বাড়িয়ে তুলছে, ঠাণ্ডা বাতাসে উড়ে আসা ঝড়ো বৃস্টির পানি ছটা। ঝড়ের তীব্রতা দেখে রিক্সাওয়ালাকে বললাম, এক পাশে সাইড করে অপেক্ষা করতে, বৃষ্টি কমুক আগে, তারপরে যাওয়া যাবে।

বাইরে এখন প্রায় সন্ধ্যার কাছাকাছি আধার নেমে এসেছে। আমরা দুজনেই পর্দার আড়ালে, চারপাশ প্রায় অন্ধকারে। ইচ্ছে করেই বাম হাত আমার হাটুর উপরে এমনভাবে ফেলে রাখলাম, যেন তার হাটুতেও একটু ছোঁয়া লাগে। মনে সুপ্ত আশা, যদি কোলের উপরে থেকে সরিয়ে সে তার হাত আরেকটু ডানে আনে, তাহলেই আমার হাতের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। নিঃস্বাস কিছুটা ভারী হওয়ার পাশাপাশি, আমি মানসিকভাবে উত্তেজিত, প্রচন্ড ইচ্ছে করছে জয়ীতাকে ছোট্ট করে একটা কিস করার; কিন্তু এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না !! তার নির্লিপ্ততার দৃঢ়তার সামনে আমার সাহস নিতান্তই অপ্রতুল মনে হচ্ছে।

বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হল না। যেমন হঠাৎ করে শুরু হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ করেই বৃষ্টি  থেমে গেল। আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। রিক্সাওয়ালাও চালাতে শুরু করল। ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্সটিটিউটের কাছাকাছি এসেই বুঝলাম, টি এস সি পর্যন্ত রিক্সা নিয়ে এগুনোর কোন জো নেই। রাস্তার প্রায় পুরোটাই হেটে চলা মানুষের দখলে। তাই, আমরাও নেমে হাটতে থাকলাম, জনস্রোতের একাংশ হয়ে। জোড়ায় – জোড়ায় তরুণ-তরুণীরা পাশাপাশি হাঁটছে, আবার একই রঙের শাড়ী পড়া মেয়েদের ছোট ছোট দলও যেমন আছে, তেমনি ছেলেদের দলও চোখে পড়ল।

লাইব্রেরী পার হওয়ার সময় দেখি রাস্তার পাশে ফুলের রিং বিক্রি করছে। বুঝে ফেললাম, ইতোমধ্যে অনেকের মাথায় দেখা ফুলের রিং এখন আমার হাতের নাগালে। ভিড়ের মধ্যে দিয়েই যতটা দ্রুত সম্ভব এগিয়ে গিয়ে একটা রিং কিনে জয়ীতার কাছে ফিরেই তার অগ্নিমূর্তির সম্মুখীন হতে হল। কিছু না বলেই হুট করে পাশ থেকে গায়েব হয়ে যাওয়াতে যতটা রাগান্বিত হয়েছিল, হাতে ফুলের রিং দেখে তার চেয়ে বেশি খুশী হল। তবে, না বলে যাওয়ার শাস্তি হিসেবে ফুলের রিং তার মাথায় আমাকেই পরিয়ে দিতে হল। শাস্তি পেয়ে শুধু খুশী হলাম তাই না, বরং মনে মনে কামনা করলাম, এমন শাস্তি যেন এ জীবনে আরো পেতে হয়।

টি এস সি পার হয়ে এখন হাটছি, বাংলা একাডেমীর দিকে। রাস্তায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি এড়িয়ে দুজনেই এগিয়ে চলছি, বই মেলার প্রবেশ গেটের দিকে। আমি এর আগে কখনো বই মেলায় আসিনি। আজই প্রথম, তাও জয়ীতার সাথে; যার সাথে আমার সম্পর্কের কোন ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না। তবে, এটা অনুভব করি তার সাথে আমার সম্পর্ক স্রেফ বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি, ঢেড় বেশি।

বইমেলায় কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করলাম, অনেকটাই উদ্দেশ্যহীনভাবে বলা চলে। বইয়ের দোকানে দোকানে গিয়ে বইয়ের পাতা উল্টালাম। দর্শনার্থীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা বেশি মনে হল; নাকি দৃস্টি বিভ্রাট – চোখ হয়ত শুধু তাদেরকেই দেখতে চেয়েছে। কিছু স্টলে সেলস গার্লসদের অনেকেই ফালগুণ উদযাপনে সামিল হয়েছে দেখে ভালো লাগল। দু’এক স্টলে কবি টাইপের লোকজনকে ঘিরে সৃষ্ট জটলা দেখে অনুমান করতে কষ্ট হলো না যে, কোনো লেখকের অটোগ্রাফ নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না কেউই।

ঘুরতে ঘুরতেই এক স্টলে জয়ীতা তার পছন্দের একটা বই কিনে উপহার দিয়ে বলল, পড়ে দেখিস, নাহিদ। বইটা  আমার খুব পছন্দের।

অবশ্য আমার হাতে দেয়ার আগে, আমার দিকে এমনভাবে পাশ ফিরে কিছু একটা লিখল, যেন আমি দেখতে না পাই সে কি লিখছে। এর পরে বহুবার বইমেলায় গিয়েছি, অনেক খ্যাতনামা লেখকের অটোগ্রাফও পেয়েছি। কিন্তু, তড়িঘড়ি করে লেখা সেই অল্প কয়েকটা লাইন, আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি। যা, আমি এখনো মাঝে মাঝে পাতা উল্টে পড়ি।

ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর মধ্যে, জীবনের প্রথম ঘটনাগুলো আজীবন মনে থাকে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই – জয়ীতার সাথে প্রথম বইমেলায় যাওয়ার প্রতিটা মুহূর্ত তাই স্মৃতিতে চিরস্থায়ী স্থান দখল করে ফেলেছে। বলতে দ্বিধা নেই, বই মেলার চেয়ে, তার সান্নিধ্য আর পাশাপাশি বসে রিক্সা ভ্রমণই আমার কাছে ছিল সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য।  তার দেয়া বইটা হাতে নিলে আমি এখনো সেই মিষ্টি সুগন্ধ পাই, যা পেয়েছিলাম তার পাশে বসে; এখনো অনুভব করি, বৃষ্টি ভেজা শরীরের সেই উষ্ণতা।

What do you think of this post?
  • Like (0)
  • Awesome (0)
  • Interesting (0)
  • Boring (0)
Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *