দি ভলান্টিয়ার্স অব রাঙ্গামাটি

এক


জুন ২০১৭ এর কোনো একদিন।
রাঙ্গামাটির স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিধ্বসের কিছুদিন পরের কথা।
খাবার বিতরন চলছে, রাঙ্গামাটির উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে।

পাশেই কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার রাখা। চেয়ারগুলোতে উপুর হয়ে শুয়ে এক শিশু একমনে ছোট্ট একটা প্লাস্টিকের খেলনা গাড়ী চালাতে ব্যস্ত। যে কেউ খেয়াল করলেই উপলব্ধি করতে মোটেও দেরী হবে না যে, আশে পাশের মানুষ বা খাবারের আয়োজনের দিকে তার মোটেও নজর নেই। তার সমস্ত মনোযোগ জুড়ে রয়েছে  ছোট্ট এক প্লাস্টিকের খেলনা গাড়ী।

শিশুটির একাগ্রতা নজরে পড়ে আশ্রয়কেন্দ্রের এক ভলান্টিয়ার্স, শাফিনের।
ইউল্যাবে পড়াশোনার সুবাদে ঢাকায় থাকলেও শাফিনের বাড়ী রাঙামাটিতে। আত্নীয়-স্বজন, শৈশবের লেখাপড়া, বন্ধু-বান্ধব সব কিছু রাঙ্গামাটি কেন্দ্রিক। তাই রোজার বন্ধে সে রাঙামাটিতে নিজের পরিবার আর বন্ধুবান্ধবের সাথেই দিন কাটাতে এসেছিল। পরে ভুমিধ্বসের ভয়াবহতায়, তার মতো আরো অনেকের সাথেই যোগ দিয়েছে ভলান্টিয়ার্স হিসেবে, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে।

আরো কিছুক্ষণ দেখার পরে, ধীর পায়ে শাফিন তার কাছে এগিয়ে যায়।
নিঃশব্দে পাশে বসে পড়ে।
মনোযোগ দিয়ে খেলায় ব্যস্ত থাকলেও শিশুটি কিছুক্ষণের মধ্যেই শাফিনের উপস্থিতি টের পায়। কিন্তু কোন ভাবান্তর নেই। আগের মতোই প্লাস্টিকের চেয়ারে উপুড় হয়ে শুয়ে গাড়ী চালাতে থাকে।

একটু সময় নিয়ে শাফিন তার সাথে আলাপচারিতা শুরু করে।
নাম, বাবার নাম, বাড়ী কোথায় ইত্যাদি ইত্যাদি।
এক পর্যায়ে জানতে চায়,

– “এই গাড়িটা কার ?”

– “এইটা আমার গাড়ী।” শিশুটি উত্তর দেয়, প্রশ্নকর্তার দিকে না ফিরেই।

– “তুমি এখানে কেন, তোমাদের বাড়িঘরের কি হইছে?”

– “আমার ঘর ভাইঙ্গা গেছে। স-অব কিছু নষ্ট হইয়া গেছে, আমার ঘরের। কিন্তু আমি আমার গাড়ী বাচাইছি।”  যেন শিশুটি কোন এক দৈববলে জানতো – অনাগত প্রশ্ন কি হতে পারে? আর তাই, প্রশ্ন করার আগেই জানিয়ে দেয় কিভাবে সে তার প্রিয় গাড়িটাকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে।

পুরো আলাপচারিতায় শিশুটি একবারের জন্যেও শাফিনের দিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন মনে করে না। মাথা নিচু করে, নিবিষ্ট মনে গাড়ী চালাতে চালাতেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায়। তারপরে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের গাড়ীকে নিয়ে। যে গাড়ীটিই তার কাছে এখন সবকিছু। যার সাথে জড়িয়ে আছে ফেলে আসা ঘরবাড়ী কিংবা শৈশবের মধুর স্মৃতি। কে জানে, এমনকি পরিবারের প্রিয় কোনো সদস্যও।

শাফিনের মন ভারী হয়ে উঠে।
কথা বাড়ানোর মতো আর কিছু খুঁজে পায় না।
দৃষ্টি সরিয়ে নেয় দূর পাহাড়ের অস্পষ্ট সবুজের দিকে।

হাতের কাছেই লাইনে দাঁড়ানো নারীপুরুষ কিংবা খাবার বিতরণে ব্যস্ত অন্য ভলান্টিয়ার্সদের কেউ ব্যাপারটি খেয়াল করে না। খেয়াল করার উপায়ও নেই তাদের। কিভাবেই বা তাঁরা জানবে যে, এই মাত্র এক শিশুর কাছ থেকে মমত্বের এক অবিস্মরণীয় উদাহরণ শিখেছে এই তরুণ।

শাফিন একা নয়।
হ্রদয়স্পর্শী এমন অনেক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁর মতো আরো প্রায় ৭০ জন ভলান্টিয়ার্সের। রাঙ্গামাটির মাটিতে আলো বাতাসে বেড়ে উঠা এই তরুণ-তরুণীদের অনেকেই পড়ালেখার সুবাদে থাকতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে, মহৎ এক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তারা সবাই একত্রিত হয়েছিল।  রোজা এবং ঈদের দিন মিলিয়ে কয়েক সপ্তাহ নিয়োজিত ছিল বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে, মানুষের সেবায়।

দুই

রাঙ্গামাটির এই ভলান্টিয়ার্সদের একত্রিত হওয়ার গল্প কম দুঃসাহসিক ছিল না।
এদের কেউ ছিল রাঙামাটি, কেউ চট্টগ্রাম, কেউ ঢাকা, কেউ কুমিল্লাতে।
রাস্তার অনেক স্থানেই ব্যাপক ভুমিধ্বসের ফলে চট্টগ্রামের সাথে রাঙ্গামটির সড়ক যোগাযোগ তখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। যাতায়াতের একমাত্র উপায় – চট্টগ্রাম থেকে সড়ক পথে কাপ্তাই। তারপর নৌপথে কাপ্তাই থেকে রাঙ্গামটি। যে যাত্রাপথের পদে পদে বাধাবিঘ্নের কমতি নেই। তাই, কতটা ঝক্কি মাথায় নিয়ে কয়েকজনকে এই পথ পার হতে হয়েছে, সেটা শুধুমাত্র ভুক্তভুগীর পক্ষেই অনুমান করা সম্ভব।

ফেসবুকের কল্যাণে অনেকেই ভূমিধ্বসের ভয়াবহতাঁর সংবাদ পেয়ে গেছে ততক্ষণে।
তার উপরে, নিত্যকার বৈকালিক আড্ডা দিতে গিয়ে চেনা শহরটাই এই তরুণদের চোখে অচেনা ঠেকে। মুষলধারে একটানা কয়েকদিনের বৃষ্টিপাতের সাথে অভাবনীয় ভয়ংকর বজ্রপাতের কারণে রাঙামাটি শহরের অনেক স্থানেই ছোটবড় ভূমিধ্বস হয়েছে। আর ভূমিধ্বস পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা দেখে নিজেরাই ঠিক করে যে তাদের কিছু একটা করা উচিৎ। এই প্রিয় শহরের জন্য।

ভূমিধ্বসের দুই দিন পরে, রাঙ্গামাটির সতেরটি সামাজিক সংগঠনের তরুণেরা একত্রে বসলো রেইনবো রেস্টুরেন্টে। অনেক আলোচনার পরে মোটামুটি সিদ্ধান্ত হলো যে, এই দুর্যোগের সময় কিছু না কিছু করা উচিৎ। তবে আলাদা আলাদাভাবে কিছু না করে, সবাই মিলে একত্রে কাজ করলে ভালো হবে। আরো সিদ্ধান্ত হলো যে, তাঁরা আগে তাদের পরিকল্পনা জেলা প্রশাসককে জানাবে। কারণ, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ইতোমধ্যে অনেকগুলো আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তাঁরা জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে সামিল হয়ে মানুষদের সহায়তা করতে চায়। 

 ঐদিন সন্ধ্যায় তাদের মধ্যে কয়েকজন গেল ডিসি অফিসে।
অফিসের ভিতরে তখন অনেক মানুষ। মেয়র, বিভিন্ন ওয়ার্ডের কমিশনার, রেড ক্রিসেন্টের লোকজন ইত্যাদিসহ আরো অনেক লোক। সবাইকে তারা চিনেও না। ডিসি’র সাথে কথা বলার সুযোগ মিলছিল না। এক পর্যায়ে তাদের সুযোগ আসে। তবে, তাদের প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কাছে যথেষ্ট মনে হয় না। কিছুটা হতোদ্যম হয়ে ডিসি অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়, জোন কমান্ডার (তখন পর্যন্ত তাকে চিনতো না)  তাদেরকে অফিসে এসে দেখা করতে বলেন। 

রাতেই জোন সদরে মিটিঙে বসে তারা প্রতিশ্রুতি দেয় যে, পরদিন থেকে ৮ টা আশ্রয়কেন্দ্রে ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে ৪০ জন ভলান্টিয়ার্স সকাল ৯ টার মধ্যে উপস্থিত থাকবে। ভলান্টিয়ার্সরা নিজস্ব সংগঠনের ব্যানারের পরিবর্তে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভলান্টিয়ার্স হিসেবে কাজ করবে। আর, নিজস্ব বন্দোবস্তে যথাসময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে হাজির থাকবে।

প্রায় মধ্যরাতেই একে একে যোগাযোগ করে তারা সকলকে পরেরদিনের বিস্তারিত জানিয়ে দেয়। যোগাযোগের সকল ব্যবস্থাই যখন বিভিন্নভাবে বিপর্যস্ত, তখন মধ্যরাতেই এতগুলো মানুষকে একটা খবর জানানো প্রায় অসম্ভব। তারপরেও এটা সম্ভব হয়েছিল, কিছু উদ্যমী নাছোড়বান্দার একাগ্র প্রচেষ্টায়।

তিন

পরদিন সকাল থেকেই তুমুল বৃষ্টি।
সিএনজি চলাচলও কম। তারপরেও ভলান্টিয়ার্সদের সবাই যথাসময়ে যার যার কেন্দ্রে হাজির হয়ে যায়। ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের কাজ নিয়ে। যে কাজের কোন সীমারেখা টানার উপায় নেই। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রায় সব ধরনের কাজেই এরা নিয়োজিত ছিল। কিছু আশ্রয়কেন্দ্রে টয়লেট পর্যন্ত পরিষ্কার করতে হয়েছে। যদিও নিজের বাড়িতে এমন কাজ কখনোই করেনি। অবশ্য, এরকম আরো অনেক কাজই মানুষের কল্যানের কথা ভেবে তারা আশ্রয়কেন্দ্রে করেছে। লোকজনের তালিকা প্রস্তুত, খাবার বিতরণ, জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি ছিল দৈনন্দিন কাজেরই অংশ।

কাজ শেষে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর এদের অনেকেই আসামবস্তি ব্রিজ আর না হয় বি এম ২ শপিং কমপ্লেক্স এর ছাদে জমায়েত হয়। শেয়ার করে নিজেদের কেন্দ্রের বিভিন্ন গল্প আর অভিজ্ঞতা। রোজার ছুটির লম্বা অবসরটুকু ব্যক্তিগত বিনোদন কিংবা আরাম-আয়েসে না কাটিয়ে দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পিছনে অনুপ্রেরণা ছিল একটাই – নিজেদের প্রিয় শহরের প্রতি ভালোবাসা। রাঙ্গামাটির জোন কমান্ডার লেঃ কর্নেল রেদোয়ানের উৎসাহ এবং সহযোগিতাও  অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর উপস্থিতি এবং  বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে দায়িত্বপালনকারী সেনাসদস্যদের উদ্যোগ ও নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টাও তাদেরকে যথেষ্ট উৎসাহ যুগিয়েছে।

ভুমিধ্বসের পর পরই উদ্ধারে নেমে পড়েছিল ফায়ার সার্ভিসের লোকজন। তাদের সাথে উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসে বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় জনসাধারণও। বিভিন্ন সংস্থা এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও প্রচুর ত্রাণ ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। প্রশাসনের সহায়তা তো প্রথম থেকেই ছিল। মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী নিজেও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় কিছু (বালতি, বদনা, স্যানিটারি ন্যাপকিন ইত্যাদি) জিনিসপত্র দিয়েছিলেন।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়। যেখানে ক্ষতিগ্রস্থদের পাশাপাশি যাদের বাড়িঘর ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো, তাদেরও এনে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিসি অফিসের মাধ্যমেই এগুলো পরিচালনা করা শুরু হয়। তাই, স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারদের টাকাপয়সা এবং অন্যান্য জিনিসপত্র বরাদ্দ দেয়া হয়। জুনের ১৪ – ১৫ তারিখে তারাই চালায়। এর পরে নজরে আসে যে, লোকজন ঠিকমতো খাবার পাচ্ছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার অভিযোগও উঠে। আবার, ত্রাণ ঠিকমতো বিতরণ করা হচ্ছে না, এমনও কথা শোনা যায়।

তারপরে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে সেনা সহায়তার প্রস্তাবে স্থানীয় সেনা রিজিয়ন তৎক্ষণাৎ রাজী হয়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন সব মিলিয়ে ২০টি আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছিল। তাঁর মধ্যে সেনাবাহিনী ৮টি আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিজিবি, পুলিশ ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ৪ টি করে আশ্রয়কেন্দ্রের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। প্রশাসনের তরফ থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতিদিনের খাবার বাবদ বরাদ্দ ছিল জনপ্রতি ৮০ টাকা। সেনা রিজিয়নের তত্ত্বাবধানে রান্না করে সেনাবাহিনী এবং বিজিবি পরিচালিত কেন্দ্রগুলোতে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়। তবে, নিজেরাই রান্না করে খেতে চাইলে মনোঘর ভাবনা কেন্দ্রে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় দ্রবাদি কিনে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানে তারা নিজেরাই রান্না করে নিতো।

চার

রাঙ্গামাটি শহর এলাকাতে প্রায় শ’দুয়েক সেনা সদস্য ৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। যারা চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি, কেন্দ্রের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করেছে। এছাড়াও রান্না করা খাবার ও খাবার পানি এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যেমন প্লেট, গ্লাস, টুথব্রাশ-টুথপেস্ট ইত্যাদিও সরবরাহ করেছে। অথচ এরাই কয়েকদিন আগে ৫ জন সহকর্মী হারিয়েছে। সেই আত্নত্যাগের ঘটনাও কম মর্মস্পর্শী নয়।

কয়েক জায়গায় ভূমিধ্বসের কারণে ১৩ জুন ২০১৭ তারিখে সকাল থেকেই চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মেইন রোড বন্ধ ছিল। মানিকছড়ি সেনা ক্যাম্পের পাশেও ভূমিধ্বস হয়েছে। ক্যাম্পের নিচেই দু’পাশেই আটকে পড়া লোকজন। ভিড় বাড়ছে একটু একটু করে। রাঙ্গামাটি সদর জোনের মেজর মাহফুজ তাঁর সাথের সৈনিকদের নিয়ে রাস্তার  উপর থেকে মাটি এবং গাছপালা সরানোর কাজে নেমে পড়েন।

তারা সবাই যখন কাজে ব্যস্ত, তখন আচমকা পাহাড় ভেঙে বিশাল এক মাটির স্তুপ পড়ে তাদের উপরে। কয়েকজন রাস্তার উপরেই মাটি চাঁপা পড়ে। তাদেরকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কম বেশি আহত হলেও এরা বেঁচে যায়। আরো ৮ জন পাহাড়ি ঢল আর মাটির সাথে প্রায় ৪০ ফুট নিচে খাদে পড়ে যায়। তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালেও মেজর মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন তানভীরসহ মোট ৫ জন শাহাদাত বরণ করেন। এদের মধ্যে সৈনিক আজিজের মৃতদেহ মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করতে,  প্রাণান্তকর চেষ্টার পরেও দুই দিন লাগে।

এমন একটা মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক ঘটনার পরেও শোক প্রকাশের ফুরসতটুকু ঐ জোনের সেনা সদস্যদের ভাগ্যে জোটেনি। বরং ছুটতে হয়েছে রাঙামাটি শহরে ভূমিধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তায় অথবা লাশ উদ্ধারের জন্যে। যে ভুমিধ্বসের ভয়াবহতা শুধুমাত্র রাংগামাটিতেই ১২০ জনের মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে বুঝানো সম্ভব নয়। সমগ্র নাগরিক জীবনে নেমে এসেছিল অভাবনীয় দুর্দশা। বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, পেট্রোল পাম্পে তেল নেই, বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সরবরাহ কম, আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্যে চট্টগ্রামে স্থানান্তরের উপায় নেই – ইত্যাদি হাজারো সমস্যা ছেকে ধরেছিল এই শহরের মানুষগুলোকে।

অসাধু ব্যবসায়ীদের অশুভ প্রচেষ্টায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশ ছোঁয়া হয়ে যায়। তবে, জেলা প্রশাসকের তড়িৎ হস্তক্ষেপে এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আন্তরিক প্রচেস্টায় তা দ্রুতই মানুষের নাগালের মধ্যে নেমে আসে। অন্যান্য সহায়তার পাশাপাশি, দীঘিনালা থেকে বিশাল এক জেনারেটর এনে শহরের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করতে বিশেষ অবদান রাখে সেনা রিজিয়ন। তাদের ইঞ্জিনিয়ার্সরা মাত্র নয়দিনের মধ্যেই রাঙ্গামাটি – চট্টগ্রাম রাস্তা চালু করতে সক্ষম হয়। যদিও বিভিন্ন স্থানের ভাঙ্গন দেখে প্রাথমিকভাবে অনেকেই ধারনা করেছিল যে, মাসখানেকের আগে এই রাস্তা চালু করা সম্ভব নয়।

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি সরকারী-বেসরকারী অনেক কর্মকর্তা- কর্মচারীরই ঈদে পরিবার পরিজনের সাথে ছুটি কাটানোর কথা ছিল। কিন্তু এরা যেতে পারেনি, যেতে পারেনি রাঙ্গামাটির ক্ষতিগ্রস্তদের ফেলে। তাই নিজের এবং পরিবারের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে অন্যের সেবায় নিয়োজিত ছিল। তবে ত্যাগের এই মহিমা অন্য উচ্চতায় উঠিয়েছে তরুণ ভলান্টিয়ার্সরা। উদ্ধার কাজে নিয়োজিতদের অনেকেই কর্তব্যের খাতিরে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু এরা সেখানে আত্ননিয়োগ করেছিল, স্বেচ্ছায়। সেখানে দিনের বেশির ভাগ সময়ই ব্যয় করছে, হাসিমুখে। এমনকি ঈদের দিনেও তারা আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষদের ফেলে যায়নি। মূলত এদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর আত্নত্যাগই ঈদের আনন্দকে এক অপার্থিব পর্যায়ে উঠিয়েছিল।

ঈদের দিনে তাদের কাজে মুগ্ধ হয়ে একজন ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন,

“ আমার আজকের ঈদের দিনটি অন্য যে কোন ঈদের দিনের মতো হয়নি।
কারণ আজ আমি নিঃস্বার্থ সেবায় আত্ননিয়োগকৃত কিছু তরুণ-তরুণীর দেখা পেয়েছি। যারা অন্যের জন্য নিজের ঈদ উৎসর্গ করেছে। এদের আত্নত্যাগের কথা কোনো পত্রিকাতে চোখে পড়েনি। অথচ এরা গত কয়েকদিন ধরেই রাঙ্গামাটির আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

ঈদের দিনে অন্য বন্ধুদের সাথে উৎসব উদযাপনের পরিবর্তে, এরা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। নতুন ঝলমলে রঙিন পোশাকের বদলে এদের গায়ে স্বেচ্ছাসেবকের সাদামাটা টি-শার্ট।

এক আশ্রয়কেন্দ্রে দুই ভাইকে দেখলাম। ফারাজ আর ফাইয়াজ।
তাদের বাবা তাদেরকে এখানে পাঠিয়েছে, মানুষকে সাহায্য করার জন্য।
তারাও হাসিমুখে দৌড়াদৌড়ি করছে। কখন কার কি লাগে ? খাবারের কুপনটা মিলিয়ে নিচ্ছে। সেনাসদস্যদেরকে খাবার বিতরণে সহায়তা করছে।
আরেক কেন্দ্রে দেখা পেলাম, এক ভাই-বোন এর। শাফিন এবং প্রিম।
এদের একজন ঢাকায় লেখাপড়া করে।
কিন্তু এখন ঈদের ছুটি কাটাচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্রে, মানুষের সেবায়।

এরকম অনেকেই আছে।
যারা রাঙ্গামাটির বাসিন্দা হলেও অন্য জায়গায় থাকতো, লেখাপড়া করতো।
কিন্তু, আজ তারা এখানে, বিপন্ন মানুষের পাশে। এদের পোশাক – পরিচ্ছদ আর চেহারা দেখে না বোঝার উপায় নেই যে, এরা অনেকেই আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়েছে। আর্থিক কষ্ট এদেরকে কখনো স্পর্শ করতে সাহস করাতো দুরের কথা, এদের কাছেও ভিড়তে পারেনি। অথচ, আজ এরা কতইনা দীনহীনভাবে ঈদ পালন করছে।

নজরুলের ভাষায় আমরা প্রতিবছর ঈদকে স্বাগত জানাই,

“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে

এলো খুশির ঈদ

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে

শোন আসমানী তাগিদ”

অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়াতেই যদি ঈদের আনন্দ নিহিত থাকে।
তাহলে এই নিঃস্বার্থ সেবায় আত্ননিয়োগকৃত তরুণ-তরুণীরাই প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পেয়েছে।“  

দশের কল্যাণে নিজের স্বার্থ উপেক্ষা করার এমন দুঃসাহস দেখানোর সুযোগ সবার জীবনে আসে না। যদি বা কখনো আসেও, সবাই নিঃস্বার্থ আত্নত্যাগের উদাহরণ সৃষ্টিতে সক্ষম হয় না। যা করে দেখিয়েছে রাঙামাটির একদল তরুণতরুণী। আর কেউ স্মরণ করুক বা নাই করুক, আশ্রয়কেন্দ্রের হাজারো আশ্রয়প্রার্থীর হৃদয়ের মণিকোঠায় যে উচ্চাসনে এরা উপবিষ্ট হতে পেরেছে, সেখান থেকে এদেরকে কেউ কোনোদিনও বিন্দুমাত্র টলাতে পারবে বলে মনে হয় না।

What do you think of this post?
  • Like (0)
  • Awesome (0)
  • Interesting (0)
  • Boring (0)
Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *